মাধবকুন্ড

দেশের সর্ববৃহৎ জলপ্রপাত মাধবকুণ্ডের অবস্থান মৌলভীবাজার জেলায়। বড়লেখা থানায় মাধবকুণ্ডের সুউচ্চ পাহাড় শৃঙ্গ থেকে শুভ্র জলরাশি অবিরাম গড়িয়ে পড়ছে। আর এই জলপ্রপাতের স্ফটিক জলরাশি দেখতে পুরো বছরই পর্যটকদের আনাগুনা পরিলক্ষিত হয় মাধবকুণ্ডে।

সবুজে আবৃত আর পাহাড়ে ঘেরা এই জলপ্রপাতটি সিলেট বিভাগের মৌলবিবাজার জেলায় অবস্থিত। ঝর্নার শব্ধ আর পাখির কলতানই এখানে কেবল এখানে নিশব্ধতার ঘুম ভাঙ্গায়। প্রায় ৮৫ মিটার উচু হতে পাথরের খাড়া পাহাড় বেয়ে শোঁ শোঁ শব্দ করে জলধারা নিচে আছড়ে পড়ছে। নিচে বিছানো পাথেরের আঘাতে পানির জলকনা বাতাসে উড়ে উড়ে তৈরি করছে কুয়াশা। ঝিরি ঝিরি সে জলকনা চারিপাশের পরিবেশকে যেমন শীতল করে তেমনি সিক্ত করে প্রকৃতিকে। ঝর্নার পানি নিচে পড়ে ছোট বড় পাথরের ফাঁক গলিয়ে মিশে যাচ্ছে বড় একটি ছড়াতে গিয়ে। এমন দৃশ্য কেবল হয়তো কল্পনায়ই দেখা যায়। ঝর্নার সম্মুখের বড় পাথরে বসে বসে আনমনে সে দৃশ্য দেখলে হয়তো স্বপ্ন ভেবে ভুল করতে পারেন। কিন্তু এটাই সত্য ।

মাধবকুণ্ড অতীত থেকেই হিন্দু সমপ্রদায়ের তীর্থ স্থান হিসাবে পরিচিত। মাধবেশ্বরের আশির্বাদ নিতে হাজার হাজার মানুষ আসেন প্রতি বছরের চৈত্র মাসে। এ সময় মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশীতে পুণ্যার্জন ও বারুনী স্নান করে পাপ মুক্তির কামনা করেন। মাধবের মন্দির ছাড়াও রয়েছে শিব মন্দির। বিশালাকার শিবলিঙ্গেরও পুজা হয়ে থাকে। চৈত্রমাসের ওই সময়ে বড় ধরনের মেলা বসে।

জলপ্রপাতের অবিরাম স্রোতধারা প্রবাহিত হওয়ায় পাহাড়ের শরীর পুরোটাই যেন কঠিন পাথরে পরিনত হয়েছে। জলরাশি নির্গত কুণ্ডের ডানদিকে রয়েছে বিশাল গুহা। আদিম যুগের মানুষ গুহায় বসবাস করলেও আধুনিক যুগের মানুষ গুহার সাথে তেমন পরিচিত নয়। তবে মাধবকুণ্ডে এলে গুহার ভেতর প্রবেশ করে নতুন আমেজ পাওয়া যায়। পাহাড়ের গভীরে তৈরি গুহাকে আধুনিক কারুকচিত পাথরের একচালা মনে হয়ে থাকে। গুহাটির সৃষ্টি প্রাকৃতিক ভাবে হয়েছে বলে অনেকে ধারণা করলেও মুলত এটি ছিল সন্যাসী মাধবেশ্বরের ধ্যান মগ্নের গোপন আস্তানা। এটি কিভাবে, করা তৈরি করেছিল তার সঠিক তথ্য আজও রহস্যাবৃত।

ইতিহাস

এ জলপ্রপাতের সুচনা কখন হয়েছিল তার সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলেও ভূ-তাত্বিকদের ধারনা প্রায় হাজার বছর আগে হিন্দু ধর্মাবলম্বী সন্যাসী মাধবেশ্বর এখানে আস্থানা করেন। পাহাড়বেষ্টিত নির্জন স্থানে সন্যাসী ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। মাধবেশ্বরের আস্থানা ঘেষে বয়েছে ঝর্ণাধারা। পাথারিয়া পাহাড়েরর প্রায় ২‘শ ৫০ ফুট উচু থেকে কল কল শব্দে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হচ্ছে। সন্যাসী তার প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করতেন ঝর্ণার শীতল জল দিয়ে। সেই থেকে প্রাকৃতিক জলধারাটির নাম মাধবকুণ্ড হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

কিভাবে যাবেন

প্রথমেই আপনাকে আসতে হবে সিলেট, মৌলবিবাজার কিংবা কুলাউড়া। বাসে করে আসতে পারেন এখানে। ঢাকা হতে সরাসরি বাস আসে এসব স্থানে। অথবা ট্রেনে করে যেতে পারেন সিলেট বা কুলাউড়া। সবচাইতে সহজ পথটি হল ট্রেনে করে কুলাউড়া আসা। ট্রেনে কুলাউড়া ষ্টেশনে নেমে সিএনজি চালিত অটোরিকশা ভাড়া করে সরাসরি মাধবকুন্ড পৌছাতে পারেন। এতে আপনার খরচ ও পরিশ্রম কম হবে। কুলাউড়ায় নেমে বাসে করেও যেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আপনাকে কাঁঠালতলী বাজারে নামতে হবে। সেখান থেকে অটোরিকশায় মাধবকুন্ড। দুরত্ব ৮ কিলোমিটার। এখানে পৌছে টিকেট কেটে মাধবকুন্ড এলাকায় প্রবেশ করে সোজা মাধবকুন্ড ঝর্নায় চলে যান। আর উপভোগ করুন প্রকৃতির অপার বিস্ময়।

কোথায় থাকবেন

এখানে জেলা পরিষদের ২টি বাংলো ও ২টি আবাসিক হোটেল রয়েছে। তাছাড়া আপনি চাইলে সিলেট কিংবা মৌলভীবাজার শহরের হোটেলেও থাকতে পারেন।

পাশের দর্শনীয় স্থান

মাধবপুর লেক

প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভুমি মৌলভীবাজার জেলায় অবস্থিত মাধবপুর লেক দেশী বিদেশী পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি স্থান। এটি মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের পাত্রখলা চা বাগানে অবস্থিত। মৌলভীবাজার থেকে ৪০ কিলোমিটার ও শ্রীমঙ্গল থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই মনোরম লেকটি।

সুনীল আকাশ, ঘাঢ় সবুজ পাহাড়, শিল্পীর তুলিতে আঁকা ছবির মত মনোরম চা বাগানের দৃশ্যে হারিয়ে যান আপন মনে। চারিদিকে সুউচ্চ পাহাড়ের মাঝখানে অবস্থিত লেকটি সত্যি অপূর্ব। লেকের ঝলমল পানি, ছায়া সুনিবিড় পরিবেশ, শাপলা শালুকের উপস্থিতি আরও মনোমুগ্ধকর করে তুলে। আস্তে আস্তে যতই সামনের দিকে এগুতে থাকবেন ততই ভাল লাগবে। মাঝে মাঝে বানর ও হনুমানের লাফালাফির দৃশ্যও চোখে পড়ে। মাধবপুর লেকে গিয়ে পৌঁছতেই সবুজ পাতার গন্ধ যে কারো মনকে চাঙ্গা করে তুলবে। চারদিকে সবুজ পাহাড়। পাশাপাশি উঁচু উঁচু টিলা। সমতল চা বাগানে গাছের সারি। হয়তো এরই মাঝে একঝাঁক পাখি অতিথিদের আমন্ত্রণ জানাবে তাদের সুরের মুর্চ্ছনা দিয়ে। পাহাড়ী পাখির গান আর নৃত্য ছাড়াও দেখা যায় নানান প্রজাতির বন্যপ্রাণী। মাধবপুর লেক যেন প্রকৃতির নিজ হাতে অঙ্কিত মায়াবী নৈসর্গিক দৃশ্য। সুনীল আকাশ আর গাঢ় সবুজ পাহাড়, শিল্পীর তুলিতে আঁকা ছবির মত চা বাগানের এই মনোরম দৃশ্য আকর্ষন করে নিয়ে যাবে ভিন্ন জগতে। চারদিকে সুউচ্চ পাহাড়ের মাঝখানে অবসি’ত লেকটি খুবই চমৎকার। প্রতিদিনই পর্যটকরা আসছেন মাধবপুর লেকে। শত শত বিনোদন প্রিয় পর্যটকদের পদভারে পুরো বছরই মুখরিত থাকে লেক।

শ্রীমঙ্গলের সব দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখতে হলে অন্তত ৩-৪ দিন সময় নিয়ে এলেই ভালো হয়। তাহলে আর দেরী না করে হাতে ৩/৪ দিন সময় নিেয় বেড়িয়ে পড়ুন শ্রীমঙ্গলের পথে প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যেতে।